
আব্দুল্লাহ আল সুমন : হাড় কাঁপানো শীত আর ঘন কুয়াশার মধ্যে টিন ও বাঁশে তৈরি জরাজীর্ণ একটি ঘরে মানবেতর জীবন যাপন করছে এক অসহায় পরিবার। মেঝের ওপর পুরোনো কাপড় ও খড় বিছিয়ে, মাত্র একটি ছেঁড়া লেপ গায়ে মুড়িয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এক মা ও তাঁর তিনটি শিশু সন্তান। এর মধ্যে তিন সন্তানের মধ্যে দুইজনই প্রতিবন্ধী, যা পরিবারটির দুর্ভোগকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ৯ নং রায়পুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের সিঁন্দুরনা নদীপাড়া গ্রামের বিলকিস আক্তার তিন সন্তান নিয়ে একা জীবনযাপন করছেন। তার বড় ছেলে ফয়সাল (১৩) এবং ছোট মেয়ে জান্নাতুল (৪) প্রতিবন্ধী। মেঝো সন্তান কাউসার (৮) সে কিছুটা সুস্থ সেই কাওছার এই এখন তার একমাত্র ভরসা।
বিলকিস আক্তারের স্বামী থাকলেও তিনি নিজেও প্রতিবন্ধী হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব নিতে সক্ষম নন। ফলে স্বামী থাকলেও যেন স্বামীর নেই—এই অসহায় অবস্থায় বিলকিস প্রতিদিন সংসার চালাতে এবং সন্তানদের দেখভাল করতে সংগ্রাম করছেন।
শীতের তীব্রতায় কাঁপছে শিশুদের শরীর। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী দুই সন্তান ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র তো দূরের কথা, তাদের জন্য নেই কোনো বিশেষ যত্ন বা চিকিৎসার ব্যবস্থাও। রাতে ঠান্ডা বাতাসে শিশুদের কান্না আর কাশির শব্দে মায়ের চোখে ঘুম আসে না।
স্থানীয়রা জানান, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অনিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভর করে কোনোমতে চলে সংসার। শীত আসার পর থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। প্রতিবন্ধী সন্তানদের দেখাশোনা করতে গিয়ে কাজের সুযোগও কমে গেছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যের।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিলকিস আক্তার বলেন— একটা লেপ দিয়েই তিনটা বাচ্চাকে জড়িয়ে রাখি। দুইটা বাচ্চা প্রতিবন্ধী—ওরা ঠান্ডা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। রাতে কাঁপতে কাঁপতে থাকে, তখন শুধু চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
অনেক সময় আশপাশের মানুষের খাবারের সাহায্য না পেলে আমাদের না খেয়েই থাকতে হয়। আজ ঘরে তেমন কোনো খাবার নেই, তাই সন্তানদের সাদা ভাত খাইয়ে দিন পার করছি।
পাশের মানুষগুলো যদি মাঝে মাঝে সাহায্য না করত, তাহলে হয়তো এই সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখাই সম্ভব হতো না।
এলাকাবাসীর দাবি , এই শীতে শুধু সরকার নয়, সমাজের বিত্তবান মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও মানবিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান— এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে পরিবারটির জন্য যদি একটি নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য ঘর নির্মাণ করে দেওয়া যায়, তাহলে বিলকিস আক্তার ও তার প্রতিবন্ধী সন্তানদের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে। এবং শীতবস্ত্র কিংবা সামান্য সহায়তাই পারে প্রতিবন্ধী দুই শিশুসহ একটি পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে।
শীতের রাতে যেন আর কোনো শিশু—বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুরা—কম্বলের অভাবে কাঁপতে না থাকে। মানবিক দায়িত্ব থেকেই এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।