৯

স্টাফ রিপোর্টার : পাঁচ-ছয় বছর আগে ঠাকুরগাঁও শহরের বাজারে ৬০০ থেকে ৭০০ স্বর্ণকার কাজ করলেও এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ২০০ থেকে ২৫০ জনে। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কারিগর কাজ হারিয়েছেন। কাজ না থাকায় কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ রাজমিস্ত্রির জোগালি, দিনমজুরি বা সবজি বিক্রি করছেন। স্থানীয় স্বর্ণকার ও ব্যবসায়ীদের মতে, সোনার দাম বৃদ্ধি, বিদেশি রেডিমেড গহনার বাজার দখল এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় অনেক কারিগরের যন্ত্রপাতিতে মরচে ধরেছে। কেউ কেউ সংসার চালাতে কাজের ড্রয়ার ও আসবাবপত্র পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। ঠাকুরগাঁও কারিগর স্বর্ণশিল্পী সমিতির সভাপতি সুকুমার রায় মঙ্গল বলেন, কয়েক বছর আগেও কারিগরদের কাজের অভাব ছিল না। এখন অনেকের সমিতির নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার সামর্থ্যও নেই। তাঁর দাবি, বিদেশ থেকে তৈরি ২২ ক্যারেটের রেডিমেড গহনা আসায় স্থানীয়ভাবে গহনা তৈরির অর্ডার কমেছে।
নর্থ সার্কুলার রোডের সুমা জুয়েলার্সের মালিক মদন কুমার দত্ত বলেন, বিয়ে বা অনুষ্ঠানের জন্য অনেকে ৫ থেকে ১০ ভরির রেডিমেড সেট কিনে দ্রুত নিয়ে যেতে চান। সাত থেকে ১০ দিন অপেক্ষা করে অর্ডারের গহনা নেওয়ার প্রবণতা কমেছে।
কারিগর সুরেশচন্দ্র বলেন, ক্রেতারা এখন অর্ডার দিয়ে কয়েক দিন অপেক্ষা করার চেয়ে দোকানে থাকা তৈরি বিদেশি ডিজাইনের গহনা কিনতে বেশি আগ্রহী। নাজমা বেগম নামের এক ক্রেতা বলেন, “অর্ডার দিয়ে গহনা বানাতে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়। রেডিমেড গহনা পছন্দ হলে সঙ্গে সঙ্গেই কেনা যায়, তাই সেটাই নিই।”
৩৫ বছরের অভিজ্ঞ স্বর্ণকার মো. লিটন ইসলাম এখন একটি জুয়েলারি দোকানের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, আগে সোনার দাম তুলনামূলক কম থাকায় ক্রেতাদের আনাগোনা ও কাজের চাপ বেশি ছিল। এখন সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় ফরমায়েশ কমেছে। বিদেশি তৈরি গহনার কারণে স্থানীয় কারিগরদের কাজ আরও সংকুচিত হয়েছে।
বিদেশি গহনার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় স্থানীয় কারিগরেরা পিছিয়ে পড়ছেন প্রযুক্তির কারণেও। নিউ মিডিয়া জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী গোপাল চন্দ্র বলেন, আধুনিক মেশিনে বিদেশি গহনা দ্রুত তৈরি হওয়ায় ফিনিশিংও আকর্ষণীয় হয়। হাতে যে হার তৈরি করতে চার দিন লাগে, মেশিনে তা এক দিনেই তৈরি করা সম্ভব। তবে এসব মেশিন কিনতে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা বা তারও বেশি লাগে, যা সাধারণ কারিগর বা ছোট ব্যবসায়ীদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় কারখানাগুলোতেও। হৃদয় জুয়েলার্স বালা কারখানার স্বত্বাধিকারী রনিক চন্দ্র বণিক বলেন, তাঁদের কারখানায় আগে পাঁচ থেকে সাতজন শ্রমিক কাজ করলেও এখন দুজনের কাজ চালানোই কঠিন। আশপাশের কয়েকটি চেইন ও রঙের কারখানাও কাজের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর মতে, হলমার্ক ও কেডিএম প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশেও মানসম্মত গহনা তৈরি সম্ভব। কিন্তু স্থানীয় মহাজনেরা দেশীয় কারিগরদের কাজ না দিয়ে বিদেশি তৈরি গহনা কিনছেন।
কাজ কমার প্রভাব পড়েছে কারিগরদের আয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও। আপন জুয়েলার্সের কারিগর বিপ্লব কুমার বলেন, এখন হালকা-পাতলা কাজ করে দিনে গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হয়। আগে তাঁর সঙ্গে চার-পাঁচজন শ্রমিক কাজ করলেও এখন একজনও নেই। কারিগর জয়নাল সিকদার বলেন, একজন দক্ষ স্বর্ণকার হতে অন্তত চার বছর কাজ শিখতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এত দিন কম আয় করে এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হওয়ায় নতুন প্রজন্মও এ কাজে আসছে না।
ক্রেতাদের গহনা কেনার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। নাফিসা তাসনিম নামের এক ক্রেতা বলেন, “হাতে বানানো গহনার চেয়ে এখন রেডিমেড গহনা বেশি পছন্দ করি। নকশা সুন্দর, পছন্দ করেই সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি।” সুমি আক্তার নামের আরেক ক্রেতা বলেন, “বিদেশি গহনার মান ও বিশুদ্ধতা নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে একটা আস্থা তৈরি হয়েছে। তাই রেডিমেড গহনাই এখন বেশি পছন্দ।”
মাসুদ রানা নামের এক ক্রেতা বলেন, “স্বর্ণের দাম বেশি, তাই গহনা কেনার সময় মান ও বিশুদ্ধতাকে বেশি গুরুত্ব দিই। রেডিমেড গহনায় এ বিষয়ে তুলনামূলক স্বস্তি পাই।”
কাজের সংকটে অনেকেই পেশা বদলেছেন। জাকির উদ্দীন নামে এক কারিগর বলেন, বর্তমানে কেউ রাজমিস্ত্রির জোগালি করছেন, কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, আবার কেউ পানের দোকান দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কারিগর ভবেশ রায়ও গহনা তৈরির কাজ ছেড়ে এখন দোকানের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করছেন। কারিগর জীবন রায় বলেন, তাঁর আশপাশের দুই থেকে তিনটি কারখানা প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ। সেখানকার কয়েকজন কারিগর কাজ না পেয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করেছেন।
স্বর্ণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, স্থানীয় কারিগরদের টিকিয়ে রাখতে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাঁদের যুক্ত করার পাশাপাশি বিদেশি রেডিমেড গহনার ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। কাজের নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন প্রজন্ম এই পেশা থেকে দূরে সরে গেলে কয়েক প্রজন্মের দক্ষতা ও ঠাকুরগাঁওয়ের স্বর্ণশিল্পের ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে।